Current Bangladesh Time
বৃহস্পতিবার নভেম্বর ২১, ২০১৯ ১১:১৮ অপরাহ্ণ
Latest News
প্রচ্ছদ  » স্লাইডার নিউজ » প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শরীফ আহমেদের গল্পঃ “পাহাড়ধ্বস” 
সোমবার আগস্ট ১২, ২০১৯ , ১০:৪৯ পূর্বাহ্ণ
Print this E-mail this

অগ্রযাত্রা ঈদ স্পেশাল

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শরীফ আহমেদের গল্পঃ “পাহাড়ধ্বস”


গল্পঃ পাহাড়ধ্বস

শরীফ আহমেদ

রাত সাড়ে আটটায় আমরা যখন সাজেকে ঢুকলাম তখন আমি চাঁদের গাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সারা দিনের প্রচন্ড বৃষ্টি শেষে সাজেক ভেলী সেজেছে অপরূপ সুন্দর সাজে। খাড়া রাস্তা বেয়ে ওঠতে ওঠতে হঠাৎ যখন আমরা মেঘের উচ্চতায় ওঠলাম তখন চারদিকে শুধু মেঘ আর মেঘ। এ এক অভূতপূর্ব মেঘের জগৎ। চারপাশে প্রচন্ড ঠান্ডা আর আবছা অন্ধকার। শুধু বাংলাদেশ নয় পৃথিবীর অন্য কোথাও এরকম মেঘের নগরী আছে কিনা সন্দেহ।
আজ বুধবার। গত রবিবার রাতে আমি মোবাইলে ফোন করে তিন হাজার টাকা বিকাশ করে ‘গরবা রিসোর্টে’ ডাবল বেডের বড় রুম বুকিং দিয়ে রেখেছিলাম। আমরা সাজেকের ‘গরবা রিসোর্টে’র সামনে নামলাম। অন্ধকার রাত। চারপাশ মেঘে ঢাকা। ঠান্ডার মধ্যে হোটেলের রিসিপশনে গিয়ে বললাম, আমাদের ঢাকা থেকে তিনতলায় রুম বুকিং দেওয়া আছে।
তিনতলায় ‘সূর্যমুখী’ নামের রুমে ঢুকলে হোটেলের ছেলেটি বললো, ডিনারের জন্য এক ঘন্টা আগে অর্ডার দিতে হয়। এখন প্রায় সোয়া নয়টা বাজে। এখানকার রেস্টুরেন্টগুলো সাড়ে আটটার পর থেকে বন্ধ হওয়া শুরু করে।
হোটেলের ছেলেটিকে নিয়ে আমি ছুটলাম খাবারের অর্ডার দিতে। হোটেলের রিসিপশন থেকে বললো, বিসমিল্লাহ রেস্টুরেন্টে যেতে। হোটেল থেকে বের হয়ে দুইটি হোটেল পার হয়ে বিসমিল্লাহ রেস্টুরেন্টে গিয়ে দেখলাম সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। তার পাশের আল মদিনা রেস্টুরেন্টে গিয়ে দেখলাম সেটাও বন্ধ হয় হয় অবস্থা। সেখানে তি জনের জন্য ভাত, ডিম, ডাল ও সবজি অর্ডার করে রুমে চলে এলাম।
হোটেলের রিসিপশনও সাড়ে নয়টায় বন্ধ হয়ে যায়। আর কোনও টুরিস্ট আসবে না মনে করে তারা সবাই হোটেলের গেইট বন্ধ করে চলে যাওয়ার কথা ভাবছিলো।
হোটেলের ছেলেটির সাথে খাবারের অর্ডার করার জন্য ছুটলাম আমি। রিসিপশন থেকে বললো, মুসলিম রেস্টুরেন্ট যাওয়ার জন্য। হোটেল থেকে বের হয়ে আরেকটা হোটেল পার হয়ে মুসলিম রেস্টুরেন্ট গিয়ে দেখলাম সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। তার পাশের আল মদিনা রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয় হয় অবস্থা। সেখানে জিজ্ঞেস করে জানা গেলো তিন জনের খাবার হবে। তবে সেটা শুধু ভাত, ডিম, সবজি ও ডাল। আমি অর্ডার দিয়ে বললাম দশটায় খেতে আসবো।
রুমে এসে গোসল করতে ঢুকলাম। সাওয়ার ছেড়ে তিরিশ সেকেন্ড ভিজার পর প্রচন্ড ঠান্ডা পানিতে গলা ব্যথা শুরু হওয়ার অবস্থা হলো। তারপর কল থেকে বালতিতে পানি নিয়ে পনেরো মিনিটে গোসল শেষ করে বের হলাম। সাওয়ার না ছেড়ে বালতিতে পানি নিয়ে গোসল করায় টনসিলাইটিস হতে কোনওমতে বেঁচে গেলাম।
সবার গোসল হওয়ার পর দশটা বাজার আগেই খেতে বের হওয়ার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু দশটা বাজার দশ মিনিট আগেই হোটেলের ছেলেটি এসে বললো – আমাদের খাবার রুমের পাশের বারান্দার নিয়ে আসা হয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখলাম দুইটি ট্রে টেবিলে খাবার সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে আর সাথে তিনটি চেয়ার।

তার আগে সেই সকাল সাতটায় আমরা খাগড়াছড়ির শাপলা চত্বর থেকে চাঁদের গাড়িতে রওয়ানা হয়েছিলাম সাজেকে আসার জন্য। কিন্তু পাঁচ-ছয় ঘন্টার সেই পথ শেষ হলো সাড়ে তেরো ঘন্টায়।
ঢাকার পান্থপথ থেকে রাত ১১টায় ‘সেন্ট মার্টিন হুন্দাই পরিবহনে’র ৩৬ সিটের এসি বাসে রওয়ানা দিয়েছিলাম খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে। সারারাত নামমাত্র ঘুমিয়ে সকাল ছয়টায় খাগড়াছড়ি শাপলা চত্বরে নামলাম।
চাঁদের গাড়ি ঠিক করা হলো। ওঠতে হবে বেইলি ব্রিজের অপর পার থেকে। নাস্তা করতে ঢুকলাম মনটানা রেস্টুরেন্টে। তন্দুরি রুটি, সবজি আর ডিম দিয়ে নাস্তা করে রওয়ানা দিতে হবে। চারটা ‘কিনলে’ পানির এক লিটারের বোতল কিনলাম। ব্যাটারি চালিত অটোতে করে বেইলি ব্রিজের অপর পারে গেলাম।
সকাল সোয়া সাতটায় চাঁদের গাড়িতে করে যাত্রা শুরু করলাম সাজেকের উদ্দেশ্যে। নয়জন যাত্রী নিয়ে চাঁদের গাড়ি ছাড়ার সাথে সাথে প্রচন্ড বৃষ্টি নামলো। সামনে ড্রাইভারের পাশে দুইজন ব্যাচেলার আর পেছনের কেভিনে আমরা ৩টি পরিবার। একেবারে সামনের সিটে সবার ব্রিফকেস ও ব্যাগগুলো রেখে দুইপাশের সিটে দুই ফ্যামিলি বসলাম। আমাদের ফ্যামিলির সাথে দুই বাচ্চা আর অন্য ফ্যামিলিটির সাথে একটি বাচ্চা। আর সবার শেষের দুই পাশের দুইটি সিটে বসলো বাচ্চাহীন নতুন দম্পতির দুই জন। দুইজন পরস্পরের মুখোমুখি বসে জীবনের মহা আশ্চর্যের মুখোমুখি হলো। প্রচন্ড বৃষ্টির পানিতে দুইজনই ভিজতে শুরু করলো। ছেলেটা যেদিকে বসলো সেদিকে গাড়ির ছাদের পানি বেয়ে কীভাবে যেন আবার ঠিক তার সিটের ওপর ঢেলে নামতে শুরু করলো।
একজন মানুষ গাড়িতে বসে আছে কিন্তু তার সারা শরীর পানি পড়ে ভিজে যাচ্ছে এটা কেমন কথা? খাগড়াছড়ি শহর থেকে বের হতে হতে দেখলাম প্রচন্ড বর্ষনে রাস্তার দুই পাশে পানির স্রোত। গাড়ির ভেতরও কয়েক জায়গায় অল্প স্বল্প পানি পড়ছে। গাড়ির মেঝেতে রাখা পানির বোতল, ছাতা ইত্যাদি ফেলে রাখা হয়েছে।
লারমা স্কোয়ারের পেট্রোল পাম্প থেকে গাড়িতে তেল নিয়ে আবার চলা শুরু করলাম।
বৃষ্টিতে ভিজে আমরা দিঘীনালা পৌঁছলাম। দিঘীনালায় সম্প্রীতি কেন্টিন ও বেকারী’র সামনে গাড়ি থামলো। ড্রাইভার আর আরেকজন পেসেঞ্জারকে কেন্টিনের ভেতর ডাকলো। বলা হলো রাস্তার অবস্থা ভালো না। সাজেক পর্যন্ত যাওয়া যাবে কি না তা অনিশ্চিত। বাইরে যাবো বাইরে যাবো বলায় আমি ছেলেকে কোলে হালকা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে গাড়ি থেকে নেমে নিয়ে কেন্টিনে গেলাম।
এখানে কেন্টিনের অপর পাশে রাস্তার ধারে একটি ছোটো লেক আর লেকের ওপর একটি কাঠের তৈরি বসার জায়গা। লেকের পার থেকে লম্বা ব্রিজের মতো কাঠের রাস্তা দিয়ে সেখানে যেতে হয়। সবাই গাড়ি থেকে নেমে সেখানে গেলো। বৃষ্টি ভালোই পড়ছে। তবু এতোক্ষণ গাড়িতে বসে থাকার যন্ত্রণা থেকে একটু মুক্তি পেতে ভিজে ভিজে সবাই সেখানে গেলো।
৯৮ টাকা দিয়ে রবির এক জিবি ডাটা, টকটাইম ও এসএমএস কিনলাম। এখানে ছাতা ছিলো। ছাতা কিনবো ভাবলেও শেষে গাড়ি তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিচ্ছে বলে আর কেনা হলে না। জুতা ভিজে গেছে অনেক। গায়ের কাপড়ও বেশ ভেজা। ঢল আর কাদা-পানির ব্যাপার।
গাড়ির মেজেতে ‘কিনলে’ পানির আটটি বোতল, জুতা আর ছাতা পড়ে আছে। খুব বিরক্তিকর পরিস্থিতি।
বাঘাইহাট চেকপোস্টো পৌঁছলাম সকাল নয়টায়। এখানে সকালে যতো গাড়ি আসবে সেগুলো সব সাড়ে দশটা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকবে। সাড়ে দশটায় সবগুলো গাড়ি আর্মিদের গাড়ির পাহারায় সাজেকের দিকে রওয়ানা দিবে। তার মানে এখানে দেড় ঘন্টা বসে থাকতে হবে।
আমরা বাঘাইহাট চেকপোস্টে সম্প্রীতি কেন্টিনে বসে থাকলাম। সাড়ে দশটা পার হলো কিন্তু গাড়ি ছাড়া হবে না। রাস্তায় পানি জমে গাড়ি চলাচল বন্ধ আছে শুনলাম। পানি সরানোর ব্যবস্থা নাকি চলছে। একটু পর আবার শুনলাম পাহাড় ধ্বসে পড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। এক্সকেভেটর দিয়ে সেনাবাহিনী মাটি সরিয়ে রাস্তা চালু করার ব্যবস্থা করছে। রাস্তা চালু হলে এখানকার চেকপোস্টে ফোন করে জানানো হবে। তখন এরা গাড়ি ছাড়ার ক্লিয়ারেন্স দিবে। যদি ক্লিয়ারেন্স না দেয় তবে এখান থেকেই খাগড়াছড়ি ফিরে যেতে হবে। এর মধ্যে পনেরোটার মতো গাড়ি এখানে জমা হয়েছে। বৃষ্টি হচ্ছে একটানা – কখনও বেশি কখনো কম। প্রায় দেড়শতাধিক যাত্রী এখানে অপেক্ষা করছে।
মেয়েটা কাঁদছে আর বলছে, পাপা বাসায় যাবো।
আমি বললাম, বৃষ্টি থামলে বাসায় যাবো।
কিন্তু এই আশ্বাসে কান্না থামছে না।
আমাদের গাড়ি আসলেই বাসায় চলো যাবো।
আর আধা ঘণ্টা পরেই আমাদের গাড়ি চলে আসবে।
কেন্টিনের বারান্দায় একটি বড় টেবিল আর বিশ-পঁচিশটির মতো প্লাস্টিকের চেয়ার। কেউ বসে আছে, কেউ দাঁড়িয়ে আছে, কেউ ছাতা মাথায় হাঁটছে রাস্তায় আর কেউ কেন্টিন থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনছে। আমি বাচ্চাদের জন্য দুইবার বিস্কুট কিনলাম। একজোড়া স্পঞ্জ স্যান্ডেল কিনলাম। বাচ্চাদের স্পঞ্জ স্যান্ডেল খোঁজ করলাম কিন্তু পেলাম না। ছাতা কিনতে চাইলাম কিন্তু ছাতা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু এভাবে কতো সময় আর কাটে?
দুপুর বারোটায় মাইকে ঘোষণা করা হলো সবগাড়ির ড্রাইভার ও একজন পেসেঞ্জারকে তাদের নাম এন্ট্রি করার জন্য। তারপর সবগুলো গাড়ি ছাড়লো। কিন্তু জানতে পারলাম – সাজেক যাওয়া যাবে কিন্তু রাস্তা পুরোপুরি ক্লেয়ার হয়নি এখনো। দুই ঘন্টা লাগতে পারে আরও বা কমও লাগতে পারে। তাই সামনের বাঘাইহাট বাজারে গিয়ে দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ করতে। যখন ক্লিয়ারেন্স হবে তখন আর খাওয়া দাওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে না।
তারপর টুরিস্টদের সবগুলো গাড়ি বাগাইঘাট বাজারে গেলো। আমরা গাড়ি থেকে নেমে আল মদিনা রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য। ভাত, গরু আর সবজি খেলাম।
সকালের একটি তন্দুরি রুটি ছিলো সাথে। সেটা রাখার সমস্যা বলে ভাবলাম খেয়ে ফেলি। কিন্তু খেতে গিয়ে অনেক তিতা লাগলো। নান রুটি এমন তিতা লাগে জীবনে দেখিনি। মুখ তিতা হয়ে গেলে বাকিটা ফেলে দিলাম। তিতা মুখ ভালো করার জন্য রেস্টুরেন্টের সামনে বানিয়ে রাখা মিষ্টি জাতীয় ময়দায় তৈরি একটা খাবার খেয়ে মুখ ভালো করলাম। ডিনার করে আধ ঘন্টা সময় কাটিয়ে আমরা আবার গাড়িতে ওঠে বসলাম।
কিন্তু ক্লিয়ারেন্সের কোনও খবর নেই।
দুপুর দুইটা বেজে গেলো। বাজারে কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম রাস্তার পানি বাড়ছে। কমার কোনও সম্ভবনা নেই। তখন আবার ড্রাইভার বললো, রাস্তার পানি সরার কোনও সম্ভবনা নেই, আপনারা কী করবেন সিদ্ধান্ত নেন।
আমি চিন্তা করলাম, রাস্তা ক্লেয়ার হওয়ার কোনও সম্ভাবনা না থাকলে আর্মিরা চেকপোস্ট থেকে খাগড়াছড়ি ব্যাক করতে না বলে কেন চেকপোস্ট পার হয়ে আমাদেরকে এখানে নিয়ে আসতো না। তাই ড্রাইভারের কথাটায় কান দিলাম না বা অন্য কাউকে বললাম না।
আর্মিদের গাড়ি দুইবার সাজেকের দিকপ গেলো আবার ফিরে এলো। আসলে কী হচ্ছে কিছু বুঝতে পারছি না আমরা। আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না পানি জমা রাস্তাটা সেখান থেকে কতো দূর তা আমি তখনো বুঝতে পারিনি। মনে হচ্ছিলো যদি দূর হয় তাহলেও একটি সিএনজি বা লোক চাঁদের গাড়িতে গিয়ে দেখে আসতাম।
আড়াইটার দিকে আর্মিদের আরেকটি গাড়ি এসে দাঁড়ালো বাজারে। গাড়ির পেছনে বসা সৈনিকরা বললো – রাস্তা ক্লেয়ার হওয়ার কোনও সম্ভবনা নেই। সাড়ে তিনটায় আমাদের আরেকটি ঘোষণা আছে, তখন ক্লেয়ারলি জানতে পারবেন যাওয়া যাবে কি না।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ঘোষণাটা পজিটিভ হবে না কি নেগেটিভ হবে?
তারা বললো, নেগেটিভ হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি, তারপরও দেখেন ঘোষণা কী হয়।
মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেলো যে আজ আর সাজেক যাওয়া যাবে না। আমি এই কথাটি অন্যদেরকে জানালাম। জুতার দোকানে বসেছিলো কয়েকজন।
দোকানদার সাজেকে থাকা একজনের সাথে মোবাইলে কথা বলে জানালো, সাজেকে এখনও বৃষ্টি হচ্ছে। আর সাজেকে বৃষ্টি হলে এখানে পানি বাড়ে। তাই সাজেকের বৃষ্টি যেহেতু বন্ধ হয়নাই তাই এখানকার পানিও কমার সম্ভবনা নেই।
আমি নয়ন ভাইকে বললাম বিষয়টি। সাজেক ভ্যালির ওয়েদার ফরকাস্ট দেখে আমি বললাম, আজ রাত ও আগামীকাল সারাদিন সাজেকে ৮০% থেকে ৯০% বৃষ্টি হবে। এখন যদি রাস্তায় পানি তাকে তবে কালকেও পানি থাকবে। কারণ সাজেকে আজকে রাতেও প্রচন্ড বৃষ্টি হবে। তাই আজকে যদি সাজেকে না যাওয়া যায় তবে কালকেও যাওয়া যাবে না। তাই আজকে খাগড়াছড়ি ব্যাক করলে আমরা ঢাকা চলে যাবো।
এতো সময় যেহেতু বসে থাকলাম তাই সাড়ে তিনটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে দেখি।
আর্মি কীভাবে বলছে যে এখনো সম্ভবনা আছে রাস্তা ক্লেয়ার হওয়ার সেটাই তো বুঝতে পারছি না।
আসলে মূল সমস্যা তো রাস্তার পানি না। পাহাড় ধ্বসে পড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে ছিলো সেটা ক্লেয়ার হলে যাওয়ার অনুমতি দিবে।
আচ্ছা ঠিক আছে দেখি তাহলে, সাড়ে তিনটা নাগাদ কী হয়। আমি বললাম।
আমরা দোকানে বসে আলাপ আলোচনা করছিলাম। আমাদের আজ রাতে সাজেকে ‘গরবা রিসোর্টে’ রুম বুকিং করা আছে আবার একদিনের ফুল পেমেন্টও দেওয়া আছে ৩০০০ টাকা। আজকে সকাল সাড়ে দশটায় আমাদের চেক-ইন করার কথা সেখানে। এখন দুপুর আড়াইটা বাজে। আমরা যে সাজেকে যেতে পারবো না সেটা নিশ্চিত হওয়া যাবে বিকাল সাড়ে তিনটার পর। হোটেল বুকিং দেওয়ার পর সেটা ক্যানসেল করার জন্য সকাল দশটার মধ্যে জানানোর কথা। এখন দশটার বদলে বারোটা বা একটার মধ্যে জানালেও হয়তো সেটা ক্যানসেল হওয়ার সম্ভবনা থাকতো। কিন্তু বিকাল চারটায় যদি বলা হয় যে আমার আজ যাবো না তাহলে সেটা শুনে হোটেলের লোকরা কী করবে? তারা দিনের শেষে সেদিনের বুকিং ক্যানসেল করে টাকা ফেরত দিবে সেরকম কোনও সম্ভবনা নেই। তার মানে সন্ধ্যা হোক, রাত হোক আমরা যদি সাজেকে গিয়ে পৌঁছাতে পারি তাহলে আমাদের আজকের রুম ভাড়াটা নষ্ট হয় না।
নয়ন ভাইদের আজকে বুকিং নেই। আগামীকালের বুকিং আছে আর টাকাও দেওয়া আছে। তারা যদি রাতে গিয়ে পৌঁছে তাহলে বরং আজকে থাকার জন্য রুম খোঁজার ঝামেলায় পড়তে হবে।
তিনটার পর একটি বিজিবির গাড়ি এলো বাজারে। তারা ওয়াকিটকিতে কোথায় যেন কথা বলে জানালো – রাস্তায় অনেক পানি। সাজেক যাওয়ার কোনও সম্ভবনা নেই। বিমান ছাড়া সেই পানি পার হয়ে যাওয়া যাবে না।
আমি ভাবিকে বললাম, নয়ন ভাইকে ফোন দিয়ে বলতে যে গাড়ি খাগড়াছড়ি ব্যাক করতে হবে।
নয়ন ভাই অল্প কিছুক্ষণ পর রাস্তার অপর পারে ডাকলো আমাকে। আমি গিয়ে দেখলাম তিনি কারও সাথে মোবাইলে কথা বলছেন। কথা শেষ করে জানালেন, সাজেকে বৃষ্টি থেমে গেছে আধ ঘন্টা হলো। সেখানে সকাল থেকে আটকে থাকা টুরিস্টদের গাড়িগুলো এইমাত্র আর্মির ক্লিয়ারেন্স পেয়ে ছেড়ে দিয়েছে। তার মানে রাস্তা ক্লেয়ার হয়েছে আর এখানকার গাড়িগুলোও ছেড়ে দিবে সাড়ে তিনটায়।
আমার কাছে বিষয়টি ঠিক ক্লেয়ার হলো না। আমার মনে হলো আর্মি রাস্তা ক্লেয়ার হওয়ার কথা বলে যদি আমাদেরকে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বসিয়ে রাখতে পারে তাহলে সাজেক থেকে যারা আসছে তাদেরকেও সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত কোথাও বসিয়ে রাখতে পারে। আমরা বসে থেকে থেকে হয়তো খাগড়াছড়ি ব্যাক করবো আর যারা সাজেক থেকে আসছে তারাও হয়তো পানির জন্য বন্ধ হওয়া রাস্তা পার হতে না পেরে আবার সাজেকে ফিরে যাবে।
দুপুর বারোটা থেকে বসে থেকে থেকে বাজার থেকে কয়েকটি গাড়ি খাগড়াছড়ি ব্যাক করেছে। দেখলাম আরেকটি মাহিন্দ্র জীপ খাগড়াছড়ির দিকে ব্যাক করলো। কিন্তু আবার কয়েক মিনিটের মধ্যে সেটা ফিরে এলো বাজারে সাজেকে যাওয়ার জন্য। আর ঠিক সাড়ে তিনটার সময় চেকপোস্টে সাড়ে তিনটায় সাজেকের উদ্দেশ্যে ছাড়ার জন্য আটকে থাকা গাড়িগুলো ছেড়ে দিলে সেগুলোও বাজারে এলো। তার মানে যারা ইচ্ছা করে খাগড়াছড়ি ব্যাক করেছিলো তাদেরকে আর্মি ফিরিয়ে এনেছে যা না আনলেও পারতো। তার মানে রাস্তা সত্যি সত্যি ক্লেয়ার হয়েছে।
আর্মির গাড়িও এলো। সব গাড়ি বাজার থেকে সাজেকের দিকে ছেড়ে গেলো শুধু আমাদের গাড়িটি ছাড়া। আমাদের ড্রাইভারের খোঁজ নেই। তাকে ফোন করে আসতে বললে সে পাঁচ-সাত মিনিট পর এসে গাড়ি টান দিলো। কিন্তু এক-দেড়শো মিটার দূরে গিয়ে থেমে গেলো। এখানে সবগুলো গাড়ি লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘটনা কী? সব গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার পরও আবার দাঁড়িয়ে পড়লো কেন? বুঝতে পারলাম – বাজারের শেষ মাথায় এখানেই সেই পানিবদ্ধতার জায়গাটা। পানি অনেক বেশি গাড়ি যেতে পারবে কি না সন্দেহ আছে যথেষ্ট। আবার শুনলাম – চাঁদের গাড়িগুলোর চাকা উঁচু তাই যেতে পারবে কিন্তু মাহিন্দ্র গাড়িগুলো দেখতে বড় হলেও চাকা একটু ছোটো তাই সেগুলো যেতে পারবে না। তারপর একটার পর একটা গাড়ি যেতে লাগলো সামনে কিন্তু আমাদের গাড়ির ড্রাইভার আবার নিখোঁজ। শুনলাম উঁচু গাড়িগুলো যাত্রীসহ পার হয়ে যাচ্ছে আর নিচু গাড়িগুলো যাত্রী ও মালামাল ছাড়া পার হচ্ছে যাতে লোড কম হওয়ায় ইঞ্জিন উঁচু থাকে। আর যাত্রী ও মালামাল নৌকা দিয়ে পার করা হচ্ছে। আমাদের গাড়ির ড্রাইভার বলছে, অন্য গাড়ি পার হলেও তার গাড়ি পানি দিয়ে যেতে পারবে না কারণ তার গাড়ির সাইলেন্সার নিচু। এখন তাহলে কী হবে? তখন বিকাল সোয়া চারটা বাজে। ড্রাইভারকে বলা হলো, তার গাড়ি যদি যেতে না পারে তাহলে অন্য গাড়িতে আমাদের তুলে দিতে। দশ মিনিট পর ড্রাইভার জানালো, পানির অপর পারে আরেকটি খালি গাড়ি আছে। নৌকায় করে আমাদেরকে মালামাল সহ পানি পার হয়ে গিয়ে সেই গাড়িতে ওঠতে হবে।
সব গাড়ি চলে গেলেও আমাদের গাড়ি যাচ্ছে না দেখে আর্মি এসে ড্রাইভারকে খোঁজে গেলো। আমি ড্রাইভারকে ফোন করে আসতে বললাম। ড্রাইভার এলো কিন্তু এখন শুনছি তার গাড়িতে না কি কী সমস্যা হচ্ছে। গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট নিচ্ছে না। তাহলে তো অবশ্যই আমাদেরকে অন্য গাড়িতে তুলে দিতে হবে। ড্রাইভার সেই গাড়ির সাথে কথা বলতে গেলো।
সাড়ে চারটা বাজে তখন। বৃষ্টি পড়ছে টিপ টিপ। তবু আমি মেয়েকে কোলে নিয়ে নেমে গিয়ে দেখলাম – সত্যি সত্যি রাস্তায় অনেক পানি জমে ফেরী পার হওয়ার মতো একটি খালের মতো হয়ে আছে। সাজেকের দিক থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি নামছে ব্রিজ তলিয়ে রাস্তার ওপর দিয়ে। দুইটি নৌকা দিয়ে মানুষ পার করা হচ্ছে। কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে আবার গাড়ির কাছে গিয়ে দেখলাম – আমাদের গাড়ির ড্রাইভার গাড়িতে স্টার্ট দিতে না পারলেও অন্য এক গাড়ির ড্রাইভার এসে গাড়ি স্টার্ট করে দিলো। তখন চারটা চল্লিশ বাজে। স্টার্ট দেওয়ার সাথে সাথে গাড়ি চলতে শুরু করলো। সেটার সামনে আবার আরেকটা গাড়ি যে গাড়ির ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট করে দিয়েছে। গাড়ি দুটি পানির কাছে গেলো। সেখানে গিয়ে যাত্রী ও মালামাল নামাবার কথা কিন্তু গাড়ি তো থামছে না। পানির এই পারে গাড়ি দুটির একটিও থামলো না। পানিতে নেমে গেলো আর অনেক দ্রুত বেগে পানি পার হতে লাগলো। সামনের গাড়ির অবস্থা স্বাভাবিক হলেও আমাদের গাড়ি পানি দিয়ে চলতে চলতে প্রচুর পরিমাণ কালো ধোঁয়া ছাড়তে লাগলো। মনে হচ্ছিলো পানির মধ্যেই অচল হয়ে থেমে যাবে। কিন্তু পানি পার হয়ে অপর পারে চলে গেলো।
আমি মেয়েকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। নয়ন ভাই ও অপু ভাইসহ আরও দুইজন দাঁড়িয়ে ছিলো। আমরা নৌকায় ওঠলাম। নৌকায় চড়ে পানির অন্য পারে গেলাম। জুতা হাতে নিয়ে নৌকা থেকে নামলাম। তখন মসজিদে আসরের আযান হতে শুরু করলো। পৌনে পাঁচটা বাজে। আমি মেয়ে কোলে জুতা হাতে কাদার ওপর হেঁটে একশ মিটার দূরে গাড়ির দিকে গেলাম। গাড়িতে হাতের চামড়ার জুতা আর মেয়েকে রেখে চেকপোস্ট থেকে কেনা স্পঞ্জ স্যান্ডেলগুলো নিয়ে মসজিদে গেলাম পায়ের কাদা ধুইতে।
প্রচন্ড স্পিডে গাড়ি পানি পার হওয়ার সময় আমার বউ আর ছেলে গাড়ি থেকে পড়ে যাচ্ছিলো। অল্পের জন্য পড়েনি। ভয়াবহ দূর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে গেলো। নির্ঘাত মৃত্যু হতে পারতো। দ্রুতগামী গাড়ি থেকে ঢলের পানিতে পড়ে গেলে।
সাড়ে পাঁচটায় মাসালং আর্মি ক্যাম্পে আবার গাড়ি থামলো।
এক ঘন্টা পর সেখান থেকে গাড়ি ছাড়লো সাজেকের উদ্দেশ্যে। পথে পাহাড় ধ্বসের কোনও চিহ্ন দেখলাম না। মনে হলো এই সারাদিন আটকে রাখা আর্মিদের রাস্তা বন্ধ থাকার অজুহাত। আমরা চলছি সাজকের দিকে। সাজেক থেকে বিকেল সাড়ে তিনটায় ছেড়ে আসা গাড়িগুলো তখনো সেখানে পৌঁছেনি।
৪৫° খাড়া ঢালের রাস্তায় চলতে চলতে বুঝতে পারলাম আমাদের গাড়িটাতে আসলেই সমস্যা। অন্য গাড়িগুলো স্বাভাবিকভাবে চললেও। আমাদের গাড়িটার গতি কম আর প্রচুর কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর একটি একটি করে সবগুলো গাড়ি আমাদের গাড়িকে ওভার টেক করে চলে গেলো। বৃষ্টিতে ভেজা পাহাড়ের প্রকৃতি। নয়ন ভাই আর তার বউ গাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে রইলো। এক জায়গায় আর্মিরা গাড়ি থামিয়ে পেছনে না দাঁড়িয়ে পেছনে বসতে বললো। এখানে দুই-তিন কিলোমিটার পর পর রাস্তার পাশে আর্মিরা দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে। সন্ধ্যার অন্ধকার হয়ে গেলো। এর মধ্যে নয়ন ভাই খেয়াল করলো গাড়ির নিচে উজ্জ্বল আলো দেখা গেলো যা আগুনের মতো দেখাচ্ছিলো। ড্রাইভারকে বললাম গাড়ির কোথায় যেন আগুন জ্বলছে। কিন্তু ড্রাইভার বললো, এইটা এক্সেলেটরের আলো। গাড়তে কোনও সমস্যা নেই।
গাড়ি খাড়া ঢালে প্রচন্ড শব্দ করে ওঠা শুরু করলে আমার ছেলে প্রচন্ড ভয় পাচ্ছিলো। ভয়ে একজনের কোল থেকে অন্য জনের কোলে যাচ্ছিলো কিন্তু কান্না থামছিলো না।
সাজেক থেকে ছয় কিলোমিটার আগে আবার গাড়ি থামলো। সবগুলো গাড়ি লাইন দিয়ে থেমে আছে। এখানে নাকি দুইটি গাড়ি ব্রেক করতে গিয়ে ঘুরে গেছে তাই রাস্তা বন্ধ হয়ে আছে। এটাই সেই জায়গা যেখানে পাহাড় ধ্বসে রাস্তা বন্ধ হয়েছিলো। এখন এই যে গাড়ি পিছলা রাস্তায় স্লিপ করে ঘুরে আড়াআড়ি হয়ে পড়ে আছে সেটা না সরানো পর্যন্ত গাড়ি চলাচল শুরু হবে না। আমাদের গাড়ি আবার খাড়া ঢালে দাঁড় করিয়ে রাখা যাবে না বলে কয়েকশ মিটার পিছিয়ে সমতল জায়গায় এনে থামিয়ে রাখলো।
আমার ছেলে প্রচন্ড কাঁদছে। আমরা গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালাম। বিশ-পঁচিশ মিনিট পরে ড্রাইভার এসে বললো, পাহাড় ধ্বসের কাদা জমে রাস্তা প্রচন্ড পিছলা হয়ে আছে তাই যাত্রী আর মালামাল নামিয়ে গাড়ি চালাতে হবে। আমরা গাড়ি থেকে নেমে যার যে কয়টা সম্ভব লাগেজ হাতে নিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। ড্রাইভার আমাদের বড় ব্রিফকেসটা নিয়ে সবার আগে চলে গেলো।
মালামাল ও বাচ্চাদের নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম অন্য গাড়িগুলো ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু শুনতে পেলাম সেগুলো যাত্রী নামালেও লাগেজ ও মালামাল নিয়েই যাচ্ছে। তার মানে মালামাল নামানোর কোনও দরকার নেই। তাই আমরা আবার পিছিয়ে এসে গাড়িতে সব মালামাল তুললাম। কিন্তু ড্রাইভারের কোনও খোঁজ নেই। ড্রাইভারকে ফোন করা হলো। সে এলো দশ মিনিট পর। এসে বললো অন্য গাড়ি মালামাল নিয়ে গেলেও তার গাড়ি যেতে পারবে না তাই সে সাজেক যাওয়ার জন্য আরেকটি গাড়ি ঠিক করেছে। আমাদেরকে লাগেজ-পত্র নিয়ে ঢালু, খাড়া, পিচ্ছিল জায়গা হেঁটে পার হয়ে গিয়ে গাড়িটিতে ওঠতে হবে। সেই গাড়ি ঢাল বেয়ে ওপরে ওঠতে পারবে না।
এক-দেড়শ মিটার রাস্তার ওপর কাদা জমে পিছলা হয়ে আছে। বুঝতে পারলাম এখানেই পাহাড় ধ্বস হয়েছিলো আর দুই-তিনশ কিলোমিটার রাস্তার পাহাড় ধ্বসের মাটি সরাতে একটু আা দুইটি ছোটো এক্সকেভেটরের চার-পাঁচ ঘন্টা লাগাতেই পারে।
অসম্ভব পিচ্ছিল রাস্তা। তার ওপর ৪৫° খাড়া ঢাল। পা ধরে রাখা সম্ভব নয়। আর একবার পিছলে পড়লে সারা শরীর কাদায় মাখামাখি হয়ে যাবে। মেয়ে কোলে নিয়ে তারপর আর হাঁটা যাবে না। যতোক্ষণ সোজা হয়ে হাঁটা যায় ততোক্ষণই ভরসা। এখানে একবার পিছলে পড়লে তারপর পড়েই থাকতে হবে। উদ্ধার করবে কে? সবারই তো একই অবস্থা।

খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক ভেলি তিন ঘণ্টার পথ। তবে পথে আর্মি ক্লিয়ারেন্স ও চেকপোস্টগুলো পার হবার নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অপেক্ষা থাকায় সেটা চার-পাঁচ ঘন্টা পর্যন্ত হতে পারে কিন্তু আমাদের লাগলো তেরো ঘন্টার বেশি। তার আগে ঢাকার বাসা থেকে খাগড়াছড়ি এসে সাজেকে রওয়ানা হতে লেগেছিলো নয় ঘন্টার বেশি। সব মিলিয়ে বাইশ-তেইশ ঘন্টার জার্নি।

সন্ধ্যা সাতটায় আমরা বেরুলাম রাস্তায়। বৃষ্টি নেই বললেই চলে। হালকা হালকা বৃষ্টি পড়ছে যার মধ্যে ছাতা হাঁটতে সমস্যা হচ্ছে না। চা খেতে দাঁড়ালাম রাস্তার পাশের একটি খাবারের দোকানের সামনে। বাঁশের নলে চা খেলাম।
আমার ছেলে বলছে, পাপা বাতায় যাবো।
মেঘপুঞ্জ রিসোর্টের গেইটে দাঁড়ালাম। ভেতরে অনেক সুন্দর পার্কের মতো সময় কাটানোর জায়গা আছে। নয়ন ভাইদের বিয়ের নাকি দশ বছর হলো। কিন্তু আমি ভাবছিলাম নিউলি ম্যারিড।
মোবাইলে বারবিকিউয়ের অর্ডার দিলো নয়ন ভাই।
রাত সাড়ে নয়টার ভেতর আমরা খেতে আসবো।

সকালে আমরা বের হলাম হাঁটতে। মাঘের কুয়াশার মতো আবছা অন্ধকার মেঘে ঘিরে আছে চারদিক। আমাদের সাথে আসা দুই জন ব্যাচেলারের একজন যে আরেকজনের শালা সেটা আমরা জানতে পারলাম।
নয়ন ভাইয়ের বউ বললো, বউরে নিয়ে ঘুরেন না, শালাকে নিয়ে ঘুরেন না এটা কেমন কথা।
মেঘপুঞ্জ রিসোর্টের গেইট থেকে কাঠের ব্রিজ পার হয়ে ভেতরের একটা কটেজের পেছনে গেলাম। কিন্তু আবার বৃষ্টি নামলো।
ঘুরা শেষ করে হোটেলে গেলাম।
আমার মেয়ে বাসায় যাবো বাসায় যাবো বলে অস্থির হয়ে কাঁদছে।
মেয়েকে বোঝালাম এটা আমাদের নতুন বাসা। নতুন বাসার বারান্দায় অনেক চেয়ার।
কিন্তু কতোক্ষণ আর এই সান্ত্বনা থাকে?
আমার মেয়ে আবার বলছে, বাসায় যাবো।
দুপুরে আবার গাড়িতে করে সাজেকের উত্তর দিকে ঘুরতে গেলাম। সবাই কংলাক পাহাড়ে ওঠতে গেলো কিন্তু বাচ্চাদের নিয়ে কাদার পথ বেয়ে পাহাড়ে ওঠা সম্ভব নয় তাই আমরা তিনজন দুই বাচ্চা নিয়ে গাড়িতে বসে থাকলাম। বৃষ্টি পড়ছে খুব। গাড়ি থেকে নামতে পারছি না। কিন্তু বাচ্চারা গাড়িতে বেশিক্ষণ বসে থাকতে চায় না। তাই বৃষ্টির মধ্যেই বাচ্চাদের নিয়ে নামলাম। ড্রাইভার গিয়েছিলো কংলাক পাহাড়ে ওঠতে তাকে ফোন করে আনা হলো। আমরা টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যেে সাজেকের জিরো পয়েন্টের পাশের হেলিপ্যাড ও মিনি পার্ক ঘুরে আর্মিদের রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। ভাত ও সবজি নিয়ে বাচ্চাদের খাওয়ালাম।তারপর পাশের রুনময় রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। রেস্টুরেন্টের পেছনে ছোটো ছোটো ঠং ঘর ও সিঁড়ি দিয়ে সুন্দর পার্কের মতো করা হয়েছে। সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে দূরে বৃষ্টি ও মেঘের অপরূপ খেলা।
বৃষ্টি পড়ছে। লাঞ্চের সময় হয়ে গেছে। সবাইকে কংলাক পাহাড় থেকে লাঞ্চ করার জন্য ‘ক্যাফে মনটানা রেস্টুরেন্টে’ নামিয়ে গাড়ি এলো আমাদের নিতে। লাঞ্চ করে হোটেলে গেলাম। বিকেলে আর বের হইনি।

রাত পৌনে আটটা। বৃষ্টিতে ভেজা রাস্তা। মেঘে আবছা অস্পষ্ট চারদিক। খাড়া ঢালু রাস্তা বেয়ে ওঠছি আমরা। সাজেক ভ্যালির এই আলৌকিক নৈসর্গের কোনও তুলনা হয় না।
মেয়েটা আমার হাত ধরে হাঁটছে।
চিম্বল রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়ালাম আমরা।
মেয়ে বলছে, হাত ধরো।
কুত্তা আগুন দেখে পালাইছে।
দুই বাচ্চাকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঠান্ডার মধ্যেও একটু ঘেমে গেলাম। ‘সাজেক রেস্টুরেন্টে’র উঁচু ঢাল পর্যন্ত ওঠলাম। সাজেক রেস্টুরেন্টের ভেতর ঢুকতেই বাতাস এসে ঘাম শুকিয়ে দিলো। তারপর সাজেক হোটেল সামনে দাঁড়ালাম আমরা। এটি আর্মিদের পরিচালিত আরেকটি হোটেল।

প্যান্ট পা থেকে বের হয়ে যাচ্ছে।
প্যান্ট গুটিয়ে দিলাম আমি।
আবছা মেঘের অন্ধকার মেখে বটগাছের নিচ দিয়ে এগুচ্ছি আমরা ‘মেঘ মাচাংয়ে’র দিকে।
পাপা দুলনাতে ওঠবো।
দুলনায় চড়ে ছবি তুলতে তুলতে বৃষ্টি নামলো। দুই বাচ্চাকে দুই কোলে নিয়ে কাদা মাটির ওপর দিয়ে হেঁটে কুঁড়ে ঘরের ভেতর ঢুকলাম।
তারপর মেঘ মাচাংয়ের ভেতর নয়ন ভাইদের কটেজে গেলাম। এক রুমের কটেজ। কটেজের তিন পাশ খোলা। দুই দরজা দিয়ে ঢুকছে মেঘ। চমৎকার থাকার জায়গা। কিন্তু দুই বারান্দা বৃষ্টির পানিতে ভেজা। বাচ্চাদের নিয়ে এখানে থাকা অসম্ভব। বারান্দার রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে বাচ্চারা লাফিয়ে নিচে খাদে পড়ে যাবে।
খুব সুন্দর ঘরটা। কিন্তু পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যে আলো নিভে গেলো। জানা গেলো কয়েকদিন ধরে রোদ নেই। তাই সৌরবিদ্যুত শেষ আর নতুন কটেজ বলে জেনারেটরের কানেকশন এখনো দেওয়া হয়নি। এখন মোবাইল চার্জ দেওয়া যাবে না আর সারা রাত আর আলোও জ্বলবে না।
ছেলেটা বললো, মোবাইল অন্য জায়গা থেকে চার্জ দেওয়ার ব্যাবস্থা করা হবে। কিন্তু একটি মোবাইল চার্জ হতে লাগে আড়াই ঘন্টা। তাহলে রাতে অন্য জায়গায় মোবাইল চার্জে দিয়ে ঘুমাতে হবে?

পুরুষ লোকটা মোটা বাঁশের বিশাল হুক্কা নিয়ে ধোঁয়া টানছিলো। তারপর সে হুক্কাটা দোকানের কেসে বসে থাকা মহিলাটাকে দিলো। লাবণ্য আর আরও তিনজন দোকানে দাঁড়িয়ে রইলো। আমি বিরক্ত হয়ে চাঁদের গাড়ির ড্রাইভারের মোবাইল নাম্বার দিয়ে মেয়েকে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে হাঁটতে হাঁটতে ‘ক্যাফে মনটানা রেস্টুরেন্টে’ গেলাম। একটু পর গাড়িকে ফোন করে ডেকে নিয়ে লাবণ্য আর অন্য তিনজন রেস্টুরেন্টে এলো। লাবণ্য মেয়েকে নিয়ে চলে গেছে হোটেলে। রাত দশটা পনেরো মিনিটে খাবার দিলো।
খাওয়া শেষ করে বাকি দুইজনের খাবার নিয়ে আমি হোটেলে গেলাম রাত এগারোটায়। ছেলে মেয়েদের ঘুম পারিয়ে সব গুছগাছ করে রাত হয়ে গেলো অনেক। রাত ১টা ২৮ মিনিট। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টির শব্দ। প্রচন্ড বৃষ্টি নামলো গহীন রাতের হিমশীতল সাজেকে। ফেইসবুকে দেখলাম খাগড়াছড়ি পুলিশ বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই প্রতিকূল আবহাওয়া ও রাস্তার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা জানিয়ে সাজেকে আসা বন্ধ করার জন্য টুরিস্টদের পরামর্শ দিয়েছে। হয়তো খুব বেশি প্রয়োজন বা জরুরি দরকার ছাড়া বা বিশেষ কোনও অনুমতি ছাড়া আগামীকাল কোনও টুরিস্টকে খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকে আসতে দেওয়া নাও হতে পারে। সেটা ছিলো বৃহস্পতিবার রাত। বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা থেকে প্রচুর টুরিস্ট খাগড়াছড়ি রওয়ানা দেয়। আর তাদের শুক্রবার দুপুর নাগাদ সাজেকে পৌঁছায়। পরে জানতে পেরেছিলাম বৃহস্পতিবার রাতে বিপুল পরিমাণ টুরিস্ট ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি আসার বাস টিকেট ফেরত দিয়েছিলো।

সকাল দশটায় হোটেল থেকে চেক আউট করে আমরা বের হলাম খাগড়াছড়ি যাওয়ার জন্য। সাজেকে অবস্থানরত সকল টুরিস্টকে সকাল সাড়ে দশটার মধ্যে সাজেক ত্যাগ করতে বলা হয়েছে। আর্মি পরিচালিত ‘সাজেক রিসোর্টের’ পাশে এসে সব গাড়ি লাইন দিয়ে দাঁড়াচ্ছিলো। এগারোটার পর সবগুলো গাড়ি একসাথে ছাড়লো। কিন্তু সেই পাহাড় ভেঙে পড়া কর্দমাক্ত রাস্তায় এসে সবগুলো গাড়ি থমকে দাঁড়ালো। সব যাত্রী নামিয়ে দিলো। গতকাল ও গতরাতের ভারি বৃষ্টিতে সেই কর্দমাক্ত রাস্তার দুইপাশ পায়ে চলার উপযুক্ত হলেও রাস্তার মাঝখান বরাবর তখনও অনেক কাদা জমে আছে। গতকাল সকালে কয়েকটি গাড়ি সাজেকে এসেছিলো। তারাও অনেক ঝুঁকি নিয়ে যাত্রী নামিয়ে এই জায়গা পার হয়েছে। কিন্তু নামার চেয়ে পিচ্ছিল ঢাল বেয়ে ওপরে ওঠা তো আরও বিপদজনক। বুধবার আসা গাড়িগুলো আজ ফিরে যাচ্ছে। কিন্তু উঠবে কী করে এই কর্দমাক্ত ঢাল বেয়ে? আমরা রাস্তার দুই পাশ ধরে হেঁটে ঢালের ওপর ওঠলাম। গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলাম কিন্তু কোনও গাড়ি ওঠার সাহস করছিলো না। একটা গাড়ি ও একটা সিএনজি ঝুঁকি নিয়ে কোনওরকম ধীরে ধীরে ওঠলো ওপরে। কিন্তু তাদের ওঠার সময় প্রতি মুহূর্তে বিপদের আশংকা দেখে বাকি গাড়িগুলো আরও ভয়ের মধ্যে পড়ে গেলো।
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পাহাড়ের ওপরে একটা উপজাতিতের বাড়িতে গেলো অনেকে। ওরা বাগান থেকে আনারস তুলে রেখেছে। সবাই আনারস খেলো। এই জীবনে আনরস তো অনেক খেয়েছি। কিন্তু এতো মিষ্টি আর এতো সুস্বাদু আনারস জীবনে কখনো খাইনি। আনারস নামক ফল যে অমৃতের মতো হয় তা আজ প্রথম জানলাম। আমার দুই বাচ্চা আমাকে এক মুহূর্তের জন্য ছাড়ছিলো না। পরিস্থিতি যখন জটিল হচ্ছিলো যতো ভয়ংকর হচ্ছিলো তারা ততো বেশি আমাকে আঁকড়ে ধরছিলো। এখনও দুই বাচ্চা দুই কাঁধে শুয়ে আছে। তাই লাবণ্য আমার মুখে ফালি ফালি করে কাটা আনারস দিচ্ছিলো। আমি স্বল্পাহারি মানুষ। কিন্তু অমৃতের মতো আনারস মুখে দেওয়ার সাথে সাথে খেয়ে নিচ্ছিলাম। বিশাল সাইজের একটা একটা আস্ত আনারস খাওয়ার পর পেটে কেমন যেন লাগছিলো। মনে হচ্ছিলো। আনারস খুব একটা সহজ সরল খাবার নয়। যতো ভালো আনারসই হোক পেট ব্যথা শুরু হবে না তো এতো বেশি আনারস খেয়ে?
এদিকে নামছে বৃষ্টি৷ কিছুক্ষণ পর আবার থামছে। এই বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়ানোর কোনও জায়গা নেই। ছাতা তো গাড়িতে। দুই বাচ্চা নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে ঢাল বেয়ে হেঁটে ওঠার পরিস্থিতিতে ছাতা নিয়ে আসার উপায় ছিলো না। আর তখন বৃষ্টি ছিলো না আা বৃষ্টির সম্ভবনাও ছিলো না।
এর মধ্যে সাজেক থেকে একটা বিশাল গাজী ট্যাংক বহনকারী চাঁদের গাড়ি এলে। গাড়ি থেকে পানি ঢেলে রাস্তা ধোয়া হলো। তারপর গাড়িগুলো ওপরে ওঠলো।

দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে খাগড়াছড়ি শাপলা চত্বরে পৌঁছলাম। প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। গাড়ি থেকে নেমে ‘হিল ভিউ’ একটি রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। সেন্ট মার্টিন হুন্দাই পরিবহনে গেলাম রাতের টিকেট কাটতে। না পেয়ে গুগলে সার্চ দিয়ে সেন্ট মার্টিন পরিবহনে ফোন করে জানতে পারলাম সিট আছে। সেখানে গিয়ে টিকেট কেটে রেস্টুরেন্টে ফিরে এলাম।
আমার মেয়ে একটা- দুইটা করে ভাত মুখে দিচ্ছে।
টেবিলের ওপর একটি মাছি ভাত খাচ্ছে।
‘অরণ্য বিলাস’ হোটেলে ওঠলাম রাত নয়টা পর্যন্ত থাকার জন্য।
বাসা কী আবার চেইঞ্জ করেছে?
হ্যা আম্মু বাসা চেইঞ্জ করেছে।
লিফটের খালি জায়গা দেখে আমার মেয়ে বললো, এটা কি ভূত ফেলার জায়গা?

রাত নয়টায় বাসে ওঠলাম। ৩৬ সিটের নরমাল হিনু গাড়িতে এসি লাগিয়ে এসি গাড়ি করা হয়েছে আর বাইরের আউটলুকটা হুন্দাই বা মার্সিডিজের মতো করা হয়েছে। একটা লাইট ভর্তি হয়ে এসির পানি জমে আছে। গাড়ি নড়ছে আর লাইট থেকে পানি পড়ছে। লাইট নষ্ট নয়। পানিও পড়ছে আর সাথে সাথে লাইটও জ্বলছে। বাস চলছে ঢাকার দিকে খাগড়াছড়ি টু ঢাকা মহাসড়ক ধরো। প্রচন্ড ঠান্ডা বাসের ভেতর। তাপমাত্রা ১৬° সেএর কম হবে। একটা কম্বল দিয়ে দুইজন মানুষ দুইটা বাচ্চা সহ শীতের হাত থেকে বাঁচতে পারছিলাম না। এক ঘন্টা কাটলো
সুপারভাইজারকে ডেকে বললাম এসি কমানো যায় কি না। সুপারভাইজার বললো, এসি একেবারে লাস্টে দেওয়া আছে। আর কমানো যাবে না। বাইরে ভারি বৃষ্টি হচ্ছে তাই এসি প্রচন্ড ঠান্ডা হয়ে আছে।
আমি বললাম, তাহলে আরেকটা কম্বল দেন।
হ্যা কম্বল দেওয়া যাবে যতক্ষণ রিজার্ভ আছে।
সুপারভাইজার একটা কম্বল দিয়ে গেলো। দুইটা কম্বল দিয়ে আমরা দুইজন দুই বাচ্চাকে ঢেকে শীত থেকে বাঁচাতে ব্যস্ত। বাচ্চা কোলে নিয়ে নিজে ঘুমালে বাচ্চার কম্বল সরে যায় আর বাচ্চা পিছলে নিচে পড়ে যাচ্ছিলো। তাই ঘুম হচ্ছিলো না।
আমি বউকে বললাম, এতো ঠান্ডা কেন? যাচ্ছে তো মানুষ। মাছ-মাংস রাখছে না কি?

Archives
Image
মেয়র হানিফ উড়ালসেতুতে বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চলাচল
Image
লোহাগড়ায় ত্রিবার্ষিক সম্মেলন নিয়ে আওয়ামী নেতাকর্মীদের ক্ষোভ
Image
বাঞ্ছারামপুর সদর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত
Image
রাজাপুরে কমিউনিটি পুলিশিং ডে উদযাপিত
Image
বঙ্গবন্ধুর নামে সড়কের নামকরণ করবে ফিলিস্তিন