Current Bangladesh Time
মঙ্গলবার সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৯ ৯:২২ অপরাহ্ণ
Latest News
প্রচ্ছদ  » স্লাইডার নিউজ » প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শরীফ আহমেদ এর গল্প- ভালোবাসার নীলিমা 
সোমবার আগস্ট ১২, ২০১৯ , ১০:০৮ অপরাহ্ণ
Print this E-mail this

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শরীফ আহমেদ এর গল্প- ভালোবাসার নীলিমা


গল্প: ভালোবাসার নীলিমা
শরীফ আহমেদ
শৈলী বিকেল তিনটায় নীলিমা ম্যাডামের বাসায় গেলো। নীলিমা ম্যাডাম ওর কলেজের নতুন সমাজবিজ্ঞানের ম্যাডাম। দুই মাস হলো এসেছেন ওদের কলেজে। তার আগে ৬ বছর ম্যাডাম সিলেট মহিলা কলেজে ছিলেন। ওর এইচএসসির রেজাল্ট খুব ভালো হয়েছে। অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানে সে এ প্লাস পেয়েছে। আর মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে সেই একমাত্র সমাজবিজ্ঞানে এই বছর এ প্লাস পেয়েছে। তাই ম্যাডাম ওকে যেতে বলেছে তার বাসায়।
ম্যাডাম একা এক বাসায় থাকেন। বয়স হয়েছে তেত্রিশ বছর কিন্তু এখনো বিয়ে করেননি। নিজে প্রতিষ্ঠিত মহিলা। তাই একা একা থাকতে কোনও সমস্যা হয় না৷ অনেকক্ষণ গল্প করার পর শৈলী জিজ্ঞেস করলো, ম্যাডাম, আপনি যে বিয়ে করেননি এখনো, আপনার বাবা মা কিছু বলে না?
আমার তো বাবা মা নেই। বিয়ের জন্য তাগিদ দেওয়ার মতো বাবা মায়ের সমতুল্য কোনও আত্মীয় স্বজনও নেই।
ওহ্, সরি ম্যাডাম। আমি আসলে না বুঝে বাবা মায়ের কথা তুললাম।
না না, সরি হওয়ার কিছু নেই। আসলে অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ার সময় আমার মা কঠিন অসুখে মারা যান অনেকটা বিনা চিকিৎসায়। তারও আগে আমি এইচএসসি পাশ করার পর আমার বাবা ইতালি চলে যায় আমাদের ছেড়ে। আমার ছোটো ভাই তখন ক্লাস সিক্সে পড়তো। বাবা খুব একটা যোগাযোগ করতো না আমাদের সাথে। আমার মায়ের সাথে কথা বলতো না। আমি ফোন করলে দুই একটা কথা বলে ফোন রেখে দিতো। মায়ের অসুখের কথা জেনেও আমার বাবা ন্যুনতম কোনও সহায়তা করলো না। মা মারা যাবার পর আমরা আর বাবার সাথে কোনও যোগাযোগ করিনি। জানি না এতোদিন পর কোথায় আছে। জানি না সে বেঁচে আছে কি না। থাক সেসব কথা। তোমার বাবা মায়ের কথা বলো। ওনারা কেমন আছেন?
আমারও তো মা নেই ম্যাডাম। আমার যখন পাঁচ বছর বয়স তখন মা মারা গেছেন। তখন থেকে বাবাই আমাকে বড় করেছেন। অসম্ভব ভালোবাসেন আমার বাবা আমাকে।
মা না থাকার কষ্টের সাথে বাবার ভালোবাসার আনন্দ। একটা কষ্টের মাঝে একটা সুখ।
আমার মা মারা গেছে আজ ১২ বছর হলো। বাবা আর বিয়ে করেনি। আমাকে ঘিরেই তারা জীবনটা কাটছে।
বাবা সপ্তাহে দুই দিন সিলেট যেতো। কোন সপ্তাহে তিনদিন আবার কোনও সপ্তাহে যেতো না।
তখন তুমি কোথায় থাকতে?
আমাদের বাসার কাছে আমার ফুপুর বাসা ছিলো। বাবা সিলেট বা ঢাকায় গেলে আমাকে ফুফুর বাসায় রেখে যেতো। তারপর আমি ক্লাস নাইটে ওঠার পর থেকে একাই বাসায় থাকতে পারতাম।
এখন তো তুমি বড় হয়েছো। ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে যাবে। তখন তোমার বাবা একা হয়ে যাবে না?
হয়তো হবে কিন্তু কী আর করা?
এখন তো তিনি ইচ্ছে করলে বিয়ে করতে পারেন।
না, করবেন না। যখন মা মারা যায় তখন করলে এক কথা ছিলো তখন বাবার বয়স ছিলো মাত্র তেত্রিশ। তখন বিয়ে করেনি আমার কষ্ট হবে বা অযত্ন হবে বলে। কিন্তু এখন বিয়ে করলে সেটা ভালো দেখা যাবে না। আর বাবার বয়স এখন ৪৫ বছর। ফুফু বলছিলো এই বয়সে বিয়ে করলে আমার লজ্জায় পড়তে হবে আর আমার বিয়েতেও সমস্যা হবে।
তোমার বাবার তাহলে আর বিয়ে করার সম্ভবনা নেই?
না, আমার জন্য বাবা এতো কিছু করেছে বিয়ে না করেও থাকতে পারবে। আর থাকবেও।
সত্যি তোমার জন্য অনেক কষ্ট করেছেন তোমার বাবা।
হুম, এমন বাবা সবার হয় না।
তোমার বাবার সাথে তো আমার কখনো দেখাই হয়নি।
বাবা তো মাঝে মাঝে কলেজে আসতো। অন্য টিচাররা তো বাবাকে সবাই চিনে। আপনি নতুন এসেছেন তাই দেখা হয়নি।
তোমার বাবার কোনও ছবি আছে এখন তোমার কাছে?
হ্যা, ম্যাডাম। অবশ্যই আছে।
দেখাও তো।
শৈলী তার মোবাইল থেকে বাবার ছবি বের করে দেখালো। নীলিমা শৈলীর বাবার ছবিটি দেখে কিছু বললো না। সে অনেক বেশ অবাক হলেও সেটা প্রকাশ করলো না।
কী হলো ম্যাডাম? এতো মনযোগ দিয়ে দেখছেন যে?
তোমার বাবা খুব সুন্দর তো তাই মুগ্ধ হয়ে গেলাম।
নীলিমা চিনতে পারলো শৈলীর বাবা সায়েমকে। না চেনার কোনও কারণ নেই। নিজের প্রিয়জনকে কে চিনতে না পারে? আজ বারোটা বছর হলো সে সায়েমের কাছে আছে। সায়েম কতোটা ভালোবাসা ওর মেয়েকে দিয়েছে তা শৈলী জানে না কিন্তু সায়েম ওকে যে ভালোবাসা দিয়েছে তা পৃথিবীতে অতুলনীয়। নীলিমার শরীর ও মনের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভরে আছে সায়েমের ভালোবাসা। কিন্তু সে কথা সে শৈলীকে বলে না। কীভাবে বলবে? নিজের বাবা সম্পর্কে যে অগাধ বিশ্বাস নিয়ে মেয়েটা এতোগুলো বছর ভালোভাবে বেঁচে আছে তা ভেঙে গেলে সে প্রচন্ড কষ্ট পাবে। আর শৈলী তো নীলিমারও মেয়ে। নীলিমা কীভাবে নিজের মেয়েকে এতো বড় কষ্ট দিবে?
শৈলী চলে যায়। নীলিমার মনে পড়ে সেই ১২ বছর আগের কথা। সে তখন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। সমাজবিজ্ঞানে সেকেন্ড ইয়ারের মাঝামাঝি সায়েমের সাথে পরিচয় হয়। মৌলভীবাজারে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও শ্রীমঙ্গলের চা বাগানে ওদের ডিপার্টমেন্টের একটা স্টাডি ট্যুর ছিলো। ট্যুর শেষে রিপোর্ট সাবমিট করতে হবে। প্রয়োজনীয় ইনফরমেশন লাগলে যেন কল করতে পারে সেজন্য চা বাগানের ম্যানেজার সায়েমের মোবাইল নাম্বার নেয় নীলিমা। এভাবে ওর পরিচয় হয় সায়েমের সাথে। তারপর মোবাইলে কথা হতো কিছুদিন। সায়েম সিলেটে তার সাথে দেখা ক্যাম্পাসে দেখা করতে গিয়েছিলো দুইদিন। বত্রিশ বছরের সেই যুবককে দেখে তার সাথে কথা বলে নীলিমা মুগ্ধ হয়ে যায়। গভীর বন্ধুত্ব হয় ওদের মধ্যে। স্ত্রী মারা যাওয়ায় সায়েম খুব একাকী ছিলো।
অনার্স থার্ড ইয়ারে মা মারা যাবার পর নীলিমা মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়ে। তখন সায়েম তাকে প্রচন্ড মানসিক ভরসা দেয়। নীলিমা অনুভব করে সায়েমের সাথে ওর যে সম্পর্ক তা প্রেম ছাড়া অন্য কিছু নয়। শুধু শারীরিক স্পর্শের সীমা বজায় রাখা ছাড়া ওদের মধ্যে দূরত্ব বলে আর কিছু নেই।
নীলিমার বাবার রেখে যাওয়া অল্প কিছু সম্পত্তি তার চাচা দেখাশোনা করতো। চাল, ডাল, সবজি ইত্যাদির পাশাপাশি নীলিমার মা চাচার কাছ থেকে মাসে তিন হাজার টাকা করে পেতো। মা, নীলিমা আর তার ভাইয়ের সংসার ও পড়াশোনার খরচ চলতো না এই টাকা দিয়ে। নীলিমা সিলেট শহরে টিউশনি করে মাসে দেড় হাজার টাকা পেতো। মায়ের অসুখের জন্য চাচার কাছ থেকে পঁচিশ হাজার টাকা ধার হয় তাদের।
মা মারা যাবার পর নীলিমার চাচা জানায় – তিনি তাদেরকে আর কোনও টাকা দিতে পারবে না। বাবার সম্পত্তির অংশ বুঝে নিয়ে তারা যেন নিজেদের খরচ নিজেরা চালায়।
চূড়ান্ত রকমের ভরসাহীনতা ও অর্থ সংকটে পড়ে নীলিমা। সে সায়েমকে বলে নিজের সব দায়িত্ব নিতে। সায়েম বলে, তার পক্ষে বিয়ে করা সম্ভব নয়। নীলিমা ওকে কোনওভাবেই রাজি করতে না পেরে বলে, সে তাদের বিয়েকে আত্মীয় স্বজন বা বন্ধ-বান্ধব কারও কাছে কখনো প্রকাশ করবে না আর নীলিমা কখনো কোনও সন্তান চাইবে না।
নীলিমা সায়েমকে ধর্মীয় নিয়মে গোপনে বিয়ে করে কিন্তু ওদের বিয়ের কোনও নিবন্ধন থাকে না। সিলেট শহরে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে বাসা ভাড়া করে ওরা থাকে। সায়েম সপ্তাহে দুই দিন এসে থাকতো নীলিমার কাছে। বেড়াতে যেতো অনেক দূরে। সায়েম না থাকলে নীলিমা মাঝে মাঝে ভার্সিটির হলে গিয়ে থাকতো।
নিবন্ধন দিয়ে কী করবে নীলিমা? আর পৃথিবীতে সবার কি সন্তান হয়? সায়েমের আদর, ভালোবাসা ও ভরসায় নীলিমা সমাজবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স করে বিসিএস শিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি কলেজের লেকচারার হিসেবে যোগ দেওয়ার পর সায়েম বলেছিলো, এখন তো তুমি আর অসহায় নও। আমাকে ছুটি দিয়ে এমন কাউকে বিয়ে করো যে তোমাকে স্ত্রীর পরিচয় ও সন্তান দিতে পারবে।
নীলিমা বলেছিলো, তুমি তোমার মেয়ে যদি তোমাকে ছুটি দিতে না পারে তবে আমি কী করে সেটা পারবো? তোমার কাছ থেকে যে ভরসা, ভালোবাসা আর আদর পেয়েছি অন্য কাউকে বিয়ে করে যে তা পাবো তার নিশ্চয়তা আছে বলে আমি মনে করি না। মাস শেষে হয়তো সে আমার বেতনের টাকার জন্য বসে থাকবে আর অন্য মেয়ের সাথে পরকীয়া করবে

Archives
Image
রাজাপুরে নারী ও শিশুর ওপর পৈচাশিক হামলা; আহত ৩
Image
মাদককারবারীদের হামলায় গুরুতর আহত যুবলীগ নেতা রিগান
Image
শরিয়তপুর সদর হাসপাতাল থেকে নবজাতক চুরির অভিযোগ
Image
লক্ষ্মীপুরে ভেজাল উপকরণ ব্যবহার করায় দুই বেকারীকে জরিমানা
Image
কুয়াকাটা বন্ধুমহল সোসাইটি’র উদ্যোগে বাঁশের সাকো নির্মাণ